জুয়েল রানা
পৃথিবী গতিশীল। প্রযুক্তি নির্ভর পৃথিবীতে মানুষ আজ বড্ড বেশি যান্ত্রিক। কখনো কখনো যান্ত্রিকতা থেকে একটু অবসর প্রয়োজন। একঘেয়ে জীবনকে সাময়িকভাবে মুক্তি দিয়ে বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নেওয়া দরকার। এ জন্য ভ্রমণই স্বস্তি দিতে পারে। বাঙালি স্বভাবতই ভ্রমণপিপাসু জাতি। শত ব্যস্ততার মাঝেও কার না ভালো লাগে একটু ঘুরে বেড়াতে । শরীর এবং মনের প্রফুল্লতা অর্জনের জন্যও ভ্রমণ।
আসুন জেনে নেই ভ্রমণে কী কী উপকারিতা আছে-
মানসিক চাপ কমানো
ভ্রমণ মানসিক চাপ কমায়। নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করার সবচেয়ে ভালো উপায়। ছুটির সময়টা অথবা দুই একদিন ছুটি নিয়ে বাসার বাইরে গিয়ে কাটান। ভ্রমণে গিয়ে, দৈনন্দিন ঝামেলা গুলো সাময়িকের জন্য ভুলে যান । ছুটি শেষে যখন ঘরে ফিরবেন, তখন একটা সতেজ বোধ এবং অনুপ্রেরণা কাজ করবে।
সামাজিক দক্ষতা
ভ্রমণে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়। আপনার পাশে বসা মানুষটির সঙ্গে আলাপ হতে পারে। এতে আপনার মনের প্রসস্তা বৃদ্ধি পাবে।সামাজিক দক্ষতা বাড়বে। অনেকেই আবার নতুন পরিবেশে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। এমন সমস্যায় ভ্রমণ হতে পারে ভালো সমাধান।

ধৈর্যশীলতা
ঘোরাঘুরি করতে গেলে আপনাকে আরো বেশি ধৈর্যশীল হতে হবে। চাওয়ামাত্রই সব হয়তো হাতের কাছে চলে আসবে না। কেননা বের হলেই দেখবেন, কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।গাড়ির অপেক্ষা, যাদের সাথে যাবেন তাদের অপেক্ষা, হোটেলের অপেক্ষা, খাবারের জন্য রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা।এসব পরিস্থিতি আপনাকে সামাল দিতে হবে।
ইতিবাচক চিন্তা
ভ্রমণ আপনাকে লক্ষ্য অর্জনেও সাহায্য করবে। ভ্রমণ করলে আপনি কিছুটা ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী হবেন। মনে করুন, পাহাড়ে ওঠার লক্ষ্য অর্জন করলেন, পরে আপনি আবার একটি লক্ষ্য ঠিক করে নিবেন। একটি জায়গা ঘুরে আসার পর আরেকটি জায়গায় ঘুরে আসতে মন আপনাকে তাড়া করবে। এভাবে লক্ষ্য অর্জন আপনাকে দিতে পারে আত্মবিশ্বাস এবং সফলতা।
মানসিকতা
বেড়াতে গেলে মানসিকতা বাড়ে। খারাপ আবহাওয়ায় তারিখ পরিবর্তন হতে পারে।বনিবনা না হলে গাড়ির পরিবর্তন হতে পারে। হোটেলের পরিবেশ ভালো না হলে হোটেল পরিবর্তন হতে পারে।দলের একেক জনের মত একেক রকম হতে পারে সে জন্য জায়গার পরিবর্তন হতে পারে। তখন নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসবই আপনাকে অনেক নমনীয় করে তুলবে। আরো বেশি মুক্তমন তৈরি করে দেবে। এসবই আপনার দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগবে। তাই জীবনের কিছুটা অংশ, থাক না রাখা ভ্রমনের জন্য ।
ভ্রমণে যাবার জন্য কি ধরণের প্রস্তুতি প্রয়োজন। আসুন জেনে নেই-
স্থান নির্বাচন
ভ্রমণ শব্দটি উচ্চারণ হলেই প্রশ্ন উঠে কোথায় যাবো। তাই ভ্রমণে যাবার পূর্বে সেই ভ্রমণ সম্পর্কিত নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা আবশ্যক। সুষ্ঠু পরিকল্পনা সুন্দর একটি ভ্রমণ। পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভ্রমণের স্থান নির্বাচন।

যাত্রাপথ
স্থান নির্বাচন হবার পর গুরুত্বপূর্ণ হলে যাত্রাপথ। কিভাবে যাবেন?ভ্রমণের জন্য পরিবহন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি বাস-লঞ্চ-ট্রেন-প্লেন-প্রাইভেট কার, কোনটায় যাবেন এটা নির্বাচন করা জরুরি। ট্র্যাফিক জ্যাম এড়াতে স্থলপথ পরিবহন না করাই শ্রেয়। এক্ষেত্রে ট্রেন প্রথম পছন্দ হতে পারে। আর সামর্থ্যবান যারা, তাদের জন্য প্লেন। তবে যে পরিবহনই আপনি ব্যবহার করেন না কেন লক্ষ্য রাখবেন, আপনার জীবনের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার বিষয়টি। এ জন্য প্রয়োজন হতে পারে ভ্রমন গাউড। ভ্রমণ অভিজ্ঞদের সহায়তা। এসব বিষয় মাথা রেখে যাত্রা শুরু করা প্রয়োজন।
কোথায় থাকবেন
বেড়াতে গেলে কোথায় থাকবেন তার ওপর আপনার ভ্রমণের অনেক আনন্দ নির্ভর করে। আপনার বাজেট, আপনার ভ্রমণ সঙ্গী কতজন, কেমন পরিবেশে থাকতে চান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন এই বিষয়গুলো ভেবেই কোথায় থাকবেন তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেখানেই যান না কেন অবশ্যই ভ্রমণকালীন আবাস আগে থেকে ঠিক করে যাওয়া ভালো। যদি আগে থেকে সম্ভব না হয় তাহলে ভালো মতো খোঁজ খবর নিয়ে যাওয়া উচিত। ছুটির দিনগুলোতে ভিড় বেশি থাকে, হোটেল মোটেলের ভাড়া বেশি হয়, এই জিনিসটা অবশ্যই মাথায় রাখবেন। যদি সম্ভব হয় ছুটির দিনগুলো এড়িয়ে গেলে অনেক কিছুতেই খরচ কমে যাবে।
খোঁজ খবর
যেহেতু ঘুরতে গেলে হাতে বেশি সময় থাকে না। তাই যেখানে যাবেন ঠিক করেছেন, তার আশপাশে কি দেখার আছে, কোথায় কোথায় ঘুরা যাবে, কবে কখন কি করবেন তা আগেই খোঁজ খবর নিয়ে একটা তালিকা করে ফেলুন। এতে আপনার সময় বাঁচবে।ভ্রমণ স্থানগুলো ভালো করে দেখতে পারবেন। আবহাওয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে খরব নিয়ে যাবেন। পাশাপাশি সেখানকার জরুরি ফোন নাম্বার এবং লোকেশন সম্পর্কে তথ্য আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখুন। যেমন- নিকটস্থ থানা (পুলিশ), টুরিস্ট পুলিশের হেল্প ডেক্স নাম্বার, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, আবাসিক হোটেল, ব্যাংক ইত্যাদি। যদি ওই এলাকার স্থানীয় কোনো পরিচিত কেউ থাকে তাহলে তার নাম্বার নেবেন। চেষ্টা করুন সেখানকার স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, তাহলে পরিবেশ সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনে নিতে পারবেন। এসব খোঁজ খবর আগে থেকেই করে রাখলে অনেক অনাকাক্ষিত সমস্যা থেকে সহজেই রেহাই পাওয়া যায়।
ব্যাগ প্যাকিং
সঙ্গে কি কি নিবেন তা নির্ভর করবে আপনি কোথায় বেড়াতে যাচ্ছেন, কতদিন থাকবেন তার ওপর। যেমন পাহাড়ে বেড়াতে গেলে অবশ্যই ব্যাগের ওজন কম রাখা প্রয়োজন। তবে যেখানেই যান না কেন ব্যাগ ভর্তি জিনিস না নিয়ে দেখেশুনে দরকারি জিনিস নেয়াই উত্তম। একটা ভারী ব্যাগ আপনার ভ্রমণ আনন্দ মাটি করে দিতে পারে। তাই ব্যাগ গোছানোর সময় ভেবে দেখুন আপনার একান্ত কি কি জামাকাপড় লাগতে পারে? সেগুলোর বাইরে সর্বাধিক একটি কিংবা দুটি জামা বেশি নিতে পারেন। টুথপেস্ট, ব্রাশ, আন্ডারওয়ার, গামছা বা তোয়ালে, ক্যাপ, জুতা, বেল্ট ইত্যাদি ছাড়াও আনুসাঙ্গিক আর কি কি প্রয়োজন হতে পারে তার একটা লিস্ট করুন। লিস্ট ধরে জিনিস ব্যাগে তুলুন, তাহলে দরকারি কোনো কিছু বাদ যাবে না।
ভ্রমণের পোশাক
শীতকালে গাঢ় রঙের মোটা তাপনিরোধক কাপড়ের তৈরি জামা পরিধান করুন। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য সঙ্গে করে মাফলার, মোজা, গ্লাভস। জামার রং অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমরা ভ্রমণে বের হওয়ার সময় লক্ষ্য রাখা উচিত। উজ্জ্বল রঙের কাপড়ে ছবি সুন্দর হয়। তবে পাহাড় বা বনাঞ্চলে ভ্রমণের সময় অবশ্যই উজ্জ্বল কোনো রঙের জামা পরিধান করা উচিত নয়। প্রচুর হাঁটতে হবে এমন ট্যুরে সাদা রঙের জামাই শ্রেয়। কেড্রস, থ্রি কোয়াটার সাথে রাখবেন।

দরকারী ডিভাইস
বেড়াতে যাবার আগে দেখে নিন আপনার প্রয়োজনীয় ডিভাইসগুলো সঙ্গে নেয়া হয়েছে কিনা। আপনার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চেকলিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। মোবাইল ফোন ছাড়া বর্তমানে জীবন কল্পনা করা যায় না। শহর থেকে দূরে গেলেও সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে মোবাইল ফোন নিয়ে নিন। রওনা দেয়ার আগে পুরো চার্জ দিয়ে নিন। সঙ্গে করে ফোনের চার্জার নিতে ভুলবেন না। পাওয়ার ব্যাংক থাকলে আরো ভালো হয়। বেড়ানোর সুন্দর স্মৃতিগুলো ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করবেন একটা ভালো ক্যামেরা সঙ্গে নিতে। ক্যামেরার ব্যাটারির চার্জ যেন ফুল থাকে। সঙ্গে করে নিতে পারেন এক্সট্রা ব্যাটারি।
ভ্রমণে রোগবালাই ও ওষুধ
সর্দি-জ্বর, পেট খারাপ, অ্যাসিডিটি, বমি, মাথা ধরা, কাশি, শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি, নাকের প্রদাহ, চোখ ওঠা, ডায়রিয়া, আমাশয়, নিউমোনিয়া প্রভৃতি রোগ হয়ে থাকে। প্রয়োজন মতো সঙ্গে ওষুধ রাখুন। আরও নিন ব্যান্ড এইড, অ্যান্টিসেপটিক, পরিমাণ মতো তুলা ও গজ। এগুলো সঙ্গে থাকলে অনেক বড় বিপদ থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব। সঙ্গে নেয়া এসব ওষুধপত্রের একটি তালিকা আগেভাগেই তৈরি করে রাখতে পারেন। প্রেশার, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে নিয়ে নিন। শীতে ভ্রমণের সময় ত্বক ও হাত-পা, চুলের বিশেষ যত্ন নেয়া প্রয়োজন। সানপ্রোটেক্ট লোশন ও ক্রিম সূর্যের আলোতে বের হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে ব্যবহার করুন। ভ্রমণে যদি প্রচণ্ড গরম অনুভব হয় তবে প্রচুর পরিমাণ পরিষ্কার বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। একটা চশমা সাথে রাখুন।
টাকা পয়সা
ভ্রমণে কত টাকা খরচ করবেন, সে ব্যাপারটি আগে থেকেই হিসাব করে ঠিক করে নিন। বাজেট অনুসারে খরচ করুন। পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা নিয়ে যাওয়া ভালো।আনুমানিক তালিকা থেকে ৩০/৪০ শতাংশ বেশি প্রস্তুতি থাকা ভালো। টাকা বহনে ভালো না লাগলে সাবধানতার সহিত কার্ড বহন করতে পারেন। বিকাশ একাউন্ট বা মোবাইলে টাকা লেনদেন করা যায় এমন কোনো একাউন্ট থাকলেও খুব কাজে লাগবে। ভাংতি টাকার ব্যবস্থা রাখবেন।মোবাইলে ব্যালেন্সও বেশি করে নিয়ে নেবেন।
ভ্রমণের খাদ্য
টুরিস্ট রেস্টুরেন্ট গুলো এড়িয়ে চলাই ভালো। যেখানে বেড়াতে গিয়েছেন সেখানে আশপাশে ঘুরে, লোকাল বসবাসকারীরা যেখানে খায় সেখানে খাওয়া-দাওয়া করাই ভালো। খরচটা কমবে। ভ্রমণে আপনি যে খাবারটি খাচ্ছেন তা স্বাস্থ্যসম্মত কি না তা যাচাই করে নেয়া উচিত।
এসএস/রানা