জিন্নাতুন্নেসা মারিয়ানা
একজন ভুল মানুষকে ভুল সময়ে তার মিথ্যে মায়ার প্যাঁচে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলাম। আমার ভালোবাসার অনুভূতিটা হয়তো পবিত্র ছিলো।।তাই আমি কল্পনার মধ্যে বাস্তবতাকে দেখতে পাই।। তার সাথে কাটানো সকল মুহুর্ত গুলোকে ডাইরি বন্দি করে রাখতে খুব ভালো লাগতো। ভেবেছিলাম পুরো ডাইরি টা লেখা শেষ হয়ে গেলে তার কাছ থেকে পাওয়া প্রথম গোলাপটা তাকে উপহার দিবো। ডাইরিতে আর তিনটা পৃষ্ঠা বাকি ছিলো। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস! তিনটা পৃষ্ঠা শেষ হওয়ার আগেই সে সব বিচ্ছেদ করে দিয়ে চলে গেলো। আমি তাকে আটকাই নি। সে ততক্ষণে অচেনার মাঝেই হারিয়ে গেছে। বাসায় ফিরে ডাইরি বন্দি রাখা স্মৃতি গুলো পড়তে খুব ইচ্ছে করছিলো। নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। হঠাৎ দেখি আমার নিথর দেহ ঝুলছে পড়ার টেবিলের ওপর সিলিং ফ্যানে।
মা আমায় ডাকছে, “অপু, মা! তাড়াতাড়ি খেতে আয়।।তোর জন্য চিংড়ির মালাই করেছি।” মায়ের ডাকে আমি দৌঁড়ে গেলাম। আমি মাকে বললাম, মা! তাড়াতাড়ি দাও। আমার খিদে লেগেছে।। কতদিন চিংড়ির মালাই খাই না।আজ কব্জি ডুবিয়ে খাবো।” দেখলাম আমার কথায় কারোর কোনো প্রতিক্রিয়া পেলাম না।যেন কেউ আমার উপস্থিতি বুঝতে পারছে না। ততক্ষণে পৃথিবী থেকে আমার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।। হঠাৎ টের পেলাম, “ওহ!! আমার দেহখানা তো সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে আছে। আমার দেহ থেকে চিরকালের জন্য আলাদা হয়ে গেছি। আমি চাইলেও তো আর আম্মুকে জড়িয়ে ধরতে পারবো না। ছোট বোনটার সঙ্গে ঝগড়া করতে পারবো না।।বন্ধুদের সাথে আর আড্ডা দিতে পারবো না।”” এসব ভেবে চিৎকার করে কাঁদছিলাম। কিন্তু আমার চিৎকার আমি ছাড়া আর কেউ শুনতে পারছে না। এখন আর সাত্বনা দেওয়ার মতো কেউ নেই। সবচেয়ে খারাপ লাগছিলো এটা ভেবে, আমি যে এখন জাহান্নামের পথিক। মা এতোবার ডাকার সত্বেও ঘরের ভেতর কোনো প্রকার আওয়াজ পাচ্ছিলো না। আমি আওয়াজ না করায় মা বাবা অনেক ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে।মা কাঁদছে। আমার ছোট বোনটা আমায় দিদিআ দিদিআ বলে ডাকছে। অথচ আমি পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু জবাব দিতে পারছি না। বাড়ির অবস্থা দেখে তখন উপলব্ধি করতে পারলাম আমি কি ভুল করেছি! ইচ্ছে করছে অতীতে চলে যেতে। আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করছে, ” আম্মু! এইতো আমি। তোমার অপু তোমার কাছে ফিরে এসেছে। আর কেঁদো না। আম্মু মাফ করে দাও আমায়।।” বারবার মনে হচ্ছিল, “আমি কিভাবে এই ভুল সিদ্ধান্তটা নিতে পারলাম৷। আমি একবারো মা- বাবা, ছোট বোনের কথা কেনো চিন্তা করলাম না? কেন ঐ বিশ্বাসঘাতকটার জন্য নিজেকে শেষ করে দিলাম? কেন? কিভাবে পারলাম? ” এসব হাজারো কেনোর উত্তর জানা ছিলো না আমার।। এখন আমার মাঝে সীমাবদ্ধতা এসে গেছে।। ততক্ষণে বাবা আমার রুমের দরজা ভেঙে ফেলে।। দরজা ভেঙেই দেখে তার অপুর নিথর দেহ ঝুলছে।। মা চোখের পলক না ফেলতে ফেলতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বাবা আমাকে দেখে স্তব্ধ।। আমার ছোট বোনটা বলছে, ” দিদিআ! দিদিআ! তুমি ঝুলে আছো কেনো? তাড়াতাড়ি নেমে আসো। তোমার সাথে পুতুল খেলবো।” এসব দেখে আমি আর নেই।।নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না।। আমার হাজার ইচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে মাটি হয়ে গেলো। সময় চলছে, আমার মৃত্যুর খবরও ছড়াচ্ছে। আমাকে অনেক লোক দেখতে আসছে। আমার আত্মীয় স্বজন, আমার বন্ধু -বান্ধব, এমনকি ঐ মিথ্যে মানুষটাও। কিন্তু সবাই যেন আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে। সবাই-ই আপসোস করছে আমার মৃত্যুর জন্য। ঐ মিথ্যে মানুষ টাও অশ্রু মুচ্ছিলো।অথচ আমার মৃত্যুর কারণটা সেই -ই ছিলো। তার মিথ্যে মায়ার ফাঁদে পা ফেলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিণতি এটা। তাকে দেখে আমার খুব রাগ হচ্ছিলো।।তার দিকে তাকাতেই চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখলাম সে কিছু একটা খুঁজছে।মনে হয় আমার ডাইরি টা খুঁজছে।। কারণ – ডাইরি টার মধ্যে ঐ লোকটার আসল রূপ লুকিয়ে আছে। অনেক খুঁজলো। কিন্তু পেলো না। জীবনের ঐ বিরক্তিকর মানুষটার জন্য; মা বাবার কথা না ভেবে, নিজের ভবিষ্যতের কথা না ভেবে এতো বড় সিদ্ধান্ত নিলাম। বার বার একই প্রশ্ন মাথার মধ্যে সাইকেলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছিলো।
বারবার মনে হচ্ছিল – “ইস! আমি যদি আবার ঐ ফিরে যেতে পারতাম, তবে আম্মুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতাম।” হঠাৎ দেখি পুলিশ এলো। আমার ঝুলন্ত নিথর দেহ নামালো। আমার ডেড বডি পোস্ট মোডামের জন্য পাঠানো হলো। আমার কক্ষ টা ময়নাতদন্ত করছে। ডাস্টবিন থেকে আমার ঐ ডাইরিটা পেলো। ততক্ষণে আমার নিথর দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে লাশ ঘরের এক কোণে ফেলে রাখলো। অথচ আমার স্বাভাবিক মৃত্যু হলে আমার দেহকে সম্মানের সহিত দাফন করা হতো। কিন্তু, এখন…… পুলিশ তদন্ত করা শুরু করে দিয়েছে৷ ইতিমধ্যে আমার মৃত্যুর কারণটাও তারা জেনে ফেলেছে। ডাইরির লেখনির উপসর্গকে সমন্বয় ঘটিয়ে ঘাতকটাকে জেল বন্দি করা হলো। কিন্তু ততক্ষণে অন্তঃপুরে হাজার হাজার মিথ্যের জোয়ার বয়ে গেলে। যখন দেখলো তাতেও কাজ হচ্ছে না তখন বাম হাতে মোটা অঙ্ক ধরিয়ে দিলো। পরক্ষণেই সে মুক্তি পেলো। তাহলে কি লাভ হলো নিজের জীবন শেষ করে? কি লাভ হলো মা – বাবা কে কষ্ট দিয়ে? হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলাম, “স্মৃতিহত্যা করতে পারলে হয়তো কেউ আত্মহত্যা করতো না।” কল্পনার মাঝেই সীমাবদ্ধ।। আম্মুর মিষ্টি ডাকে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। আম্মুকে কিছু না বললেই জড়িয়ে ধরলাম।
এসএস/রানা